একটি ইমেইলের অবিশ্বাস্য টাইম মেশিনের গল্প

· Prothom Alo

২০০৫ সালের পৃথিবীটা কেমন ছিল? তখন ফ্লিপ ফোনের খুব চল। নেটফ্লিক্স তখনো ইন্টারনেটে সিনেমা দেখাত না। তারা ডিভিডি পাঠাত ডাকযোগে। আমি তখন কাজ করতাম ফোর্বস ম্যাগাজিনে। তখনকার দিনে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলোকে কেউ খুব একটা পাত্তা দিত না। মনে করা হতো, এরা যেন মূল পত্রিকার ছায়ায় থাকা একদল লাজুক কিশোর!

Visit lej.life for more information.

ডিজিটাল মিডিয়ার জগৎটা তখনো একদম নতুন। সব কিছুই বেশ এলোমেলো। আমার মতো নতুন সাংবাদিকেরা ইন্টারনেটের এই অদ্ভুত জগৎ নিয়ে দারুণ মেতে ছিলাম। আমরা নতুন কিছু করার সুযোগ খুঁজতাম। অন্যদিকে ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপন বিভাগ পড়ে ছিল সেই পুরোনো যুগে। তারা ইন্টারনেটকে খদ্দেরদের খুশি করার একটা ফ্রি উপহারের মতো ভাবত।

একদিন আমাদের বিজ্ঞাপন বিভাগ একটা বড় চুক্তি করে বসল। ক্লায়েন্ট ছিল একটা আইটি কোম্পানি। আমাকে বলা হলো যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন নিয়ে একটা বিশেষ রিপোর্ট তৈরি করতে। আমি ছিলাম টেলিকম রিপোর্টার। রাউটার ও নেটওয়ার্ক সুইচ নিয়ে ডজনখানেক গল্প লিখতে আমার মোটেও ইচ্ছা করছিল না। আমার তৎকালীন সম্পাদক মাইকেল নোয়ারও এই আইডিয়া শুনে বেশ বিরক্ত হলেন।

তাই আমরা একটা দারুণ ফন্দি আঁটলাম। নেটওয়ার্কিং হার্ডওয়্যার ছাড়া অন্য সব দিক থেকে আমরা এই যোগাযোগের বিষয়টাকে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিলাম। বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি. ক্লার্ককে দিয়ে একটা প্রবন্ধ লেখালাম। বিষয় ছিল, কীভাবে প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

গুগল স্টোরেজ ফুল হলে টাকা খরচ না করে যেভাবে জায়গা খালি করবেন
একদিন আমাদের বিজ্ঞাপন বিভাগ একটা বড় চুক্তি করে বসল। ক্লায়েন্ট ছিল একটা আইটি কোম্পানি। আমাকে বলা হলো যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন নিয়ে একটা বিশেষ রিপোর্ট তৈরি করতে।

আমি নিজে লিখলাম ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় নিয়ে। আরও লিখলাম দারুণ সব বিখ্যাত মানুষের সাক্ষাৎকার। নোয়াম চমস্কি বললেন ভাষার আবিষ্কার নিয়ে। জেন গুডঅল বললেন প্রাইমেট বা বানরদের যোগাযোগ নিয়ে। স্ট্যান লি জানালেন ছবির সঙ্গে শব্দের ব্যবহার।

সময়টা যেহেতু ২০০৫ সাল, তাই বিজ্ঞাপন বিভাগ ক্লায়েন্টকে ইন্টারনেটে নতুন কিছু একটা করে দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আমরা ভাবলাম, সময়ের সীমানা পেরিয়ে যোগাযোগ নিয়ে কিছু একটা করলে কেমন হয়? মাথায় এল টাইম ক্যাপসুলের আইডিয়া।

কিন্তু সাধারণ টাইম ক্যাপসুল তো ভীষণ একঘেয়ে! মাটির নিচ থেকে ৫০ বছর আগের পুরোনো পত্রিকা বা খেলনা তুলে এনে লাভ কী? ওসব পত্রিকা তো লাইব্রেরি বা ইন্টারনেটেও পাওয়া যায়। তাই আমরা এই ধারণাকে একুশ শতকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা বানালাম একটা ‘ইমেইল টাইম ক্যাপসুল’।

আমাদের ওয়েবসাইটে আমরা একটা টুল তৈরি করলাম। সেখানে যে কেউ নিজেকে একটা ইমেইল বা চিঠি লিখতে পারবে। এরপর সে নিজেই ঠিক করে দেবে, ওই ইমেইলটা সে কত দিন পর পেতে চায়। এক, তিন, পাঁচ, দশ নাকি কুড়ি বছর পর!

এই টুল সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। আইডিয়াটা দারুণ হিট হলো! লাখ লাখ মানুষ ভবিষ্যতের নিজেকে ইমেইল লিখল। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। এতগুলো ইমেইল জমিয়ে রাখা ও সময়মতো পাঠানোর ব্যবস্থা করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়।

পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করে হ্যাকারদেরই সাহায্য করছেন কি
আমাদের ওয়েবসাইটে আমরা একটা টুল তৈরি করলাম। সেখানে যে কেউ নিজেকে একটা ইমেইল বা চিঠি লিখতে পারবে। এরপর সে নিজেই ঠিক করে দেবে, ওই ইমেইলটা সে কত দিন পর পেতে চায়।

ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো কিছুই তো স্থায়ী নয়। হার্ডড্রাইভ যেকোনো সময় নষ্ট হতে পারে। পুরোনো ফরম্যাট বাতিল হয়ে যেতে পারে। ফ্লপি ডিস্কের কথা মনে আছে? ওগুলো তো এখন জাদুঘরে রাখার মতো জিনিস! তাহলে এতগুলো ইমেইল বাঁচিয়ে রাখার উপায় কী? ঠিক সময়ে সেগুলো পাঠানোই বা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?

আমরা একটা দারুণ বুদ্ধি বের করলাম। এমন একটা প্রোগ্রাম বানালাম, যা তিনটি আলাদা কোম্পানির তিনটি আলাদা কম্পিউটারে চলবে। প্রতিটি কম্পিউটারে ইমেইলগুলোর একটি করে কপি থাকবে। কয়েক মাস পরপর তারা একে অপরকে সংকেত পাঠাবে। প্রথম বছর শেষে A কম্পিউটার সব ইমেইল পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু A যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে B কম্পিউটার সেই দায়িত্ব নেবে। এভাবেই চলতে থাকবে।

এরপর আমরা ভাবলাম, এই প্রোগ্রামগুলো কোথায় রাখা যায়? আমরা তিনটি আলাদা জায়গায় এগুলো রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রথমটি হলো আমাদের ফোর্বস ম্যাগাজিনের সার্ভার। দ্বিতীয়টি তখনকার ইন্টারনেট জায়ান্ট ইয়াহু। আর তৃতীয়টি কোডফিক্স কনসালটিং। এটি ছিল আমার কলেজের বন্ধু গ্যারিসন হফম্যানের চালানো একটি ছোট্ট আইটি কোম্পানি।

আমরা ভেবেছিলাম, বিশাল মিডিয়া, ইন্টারনেট জায়ান্ট ও একটা ছোট কোম্পানি মিলে আমাদের ইমেইলগুলো চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। এখানে আর কী ভুল হতে পারে? আসলে সবকিছুই ভুল হয়েছিল! প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই ইয়াহু কর্মী ছাঁটাই শুরু করল। আমাদের প্রোগ্রামটা সেখান থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ করল না। ফোর্বস ম্যাগাজিনও বিক্রি হয়ে গেল। আমাদের ডিজিটাল টিম মূল পত্রিকার সঙ্গে গেল মিশে। শেষমেশ ওই ছোট্ট কোম্পানির গ্যারিসন একাই প্রথম বছরের ইমেইলগুলো পাঠাল। এরপর তৃতীয় বছর এবং পঞ্চম বছরেও সে একাই এই কাজ করল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অদৃশ্য বৈষম্য ও আমাদের ভবিষ্যৎ
আমরা তিনটি আলাদা জায়গায় প্রোগ্রামগুলো রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রথমটি হলো আমাদের ফোর্বস ম্যাগাজিনের সার্ভার। দ্বিতীয়টি তখনকার ইন্টারনেট জায়ান্ট ইয়াহু। আর তৃতীয়টি কোডফিক্স কনসালটিং।

দশম বার্ষিকী যখন ঘনিয়ে এল, তখন আমি আর ফোর্বস-এ কাজ করি না। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছিলাম। ইমেইল টাইম ক্যাপসুলের কথা পুরোপুরি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রজেক্টটা বেঁচে ছিল। কারণ কেউ একজন এর কথা ভোলেনি!

ইমেইল পাঠানোর কয়েক মাস আগে গ্যারিসন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল। আমরা দুজন মিলে আবার সব ইমেইল পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। আমাদের পরিকল্পনাগুলো ভেস্তে গেলেও এই নতুন ব্যবস্থায় কাজ বেশ ভালোই চলছিল। আমরা আমাদের ডিজিটাল ক্যালেন্ডারে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখলাম। প্রজেক্টটা সুরক্ষিত মনে হচ্ছিল।

কিন্তু এর ঠিক দুই বছরের মাথায় একটা বড় ধাক্কা খেলাম। গ্যারিসন হফম্যান মাত্র ৪৬ বছর বয়সে হঠাৎ মারা গেল। এভাবেই পার হয়ে গেল আরও আটটি বছর। আমি এখনো আমার বন্ধুকে খুব মিস করি। কয়েক মাস আগে যখন আমার ক্যালেন্ডারে কুড়ি বছরের রিমাইন্ডারটা বেজে উঠল, তখন বুঝতে পারলাম কেন গ্যারিসনকে আমি এত পছন্দ করতাম। আমি বেশ আতঙ্কের সঙ্গেই আমার ইমেইল ইনবক্স খুঁজছিলাম। এখন কী করা যায়?

হঠাৎ সেখানে একটা ইমেইল খুঁজে পেলাম। গ্যারিসন তার কাজের সব খুঁটিনাটি সেখানে লিখে রেখেছিল। সে তার কোডের ব্যাকআপ এবং সার্ভারের সব প্রযুক্তিগত তথ্য যত্ন করে রেখে গিয়েছিল, যাতে আমার কোনো সমস্যা না হয়!

ইন্টারনেট আর্কাইভ: এক ট্রিলিয়ন ওয়েবসাইটের ডিজিটাল জাদুঘর
গ্যারিসন হফম্যান মাত্র ৪৬ বছর বয়সে হঠাৎ মারা গেল। এভাবেই পার হয়ে গেল আরও আটটি বছর। আমি এখনো আমার বন্ধুকে খুব মিস করি।

আমি তৎক্ষণাৎ আমার পুরোনো সম্পাদক মাইকেল নোয়ারকে ফোন করলাম। আমরা দুজন মিলে বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি নিলাম। আর এই তো, দেখতে দেখতে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ তাদের পুরোনো এক বন্ধুর কাছ থেকে ইমেইল পেয়ে গেল! আর সেই বন্ধুটি হলো তাদেরই অতীত সত্তা।

এই ঘটনা থেকে আমি একটা বড় শিক্ষা পেয়েছি। প্রযুক্তি এই প্রজেক্টকে বাঁচিয়ে রাখেনি। বাঁচিয়ে রেখেছে মানুষের সম্পর্ক। এক বছর থেকে বিশ বছর পর্যন্ত এই টাইম মেশিন টিকে ছিল শুধু বন্ধুদের যোগাযোগের কারণে। বিশাল ইন্টারনেট জায়ান্ট ইয়াহু হারিয়ে গেছে। কিন্তু একটা সাধারণ মানুষের কাজের প্রতি একাগ্রতা ও বন্ধুত্ব সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, ফোর্বসের সেই আসল রিপোর্টের ওয়েবপেজ এখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ছবিগুলো হারিয়ে গেছে, লিংকগুলো কাজ করে না। কিন্তু ইমেইলগুলো ঠিকই বেঁচে আছে। আর এত বছর পর সেই ইমেইলগুলো খোলা সত্যিই এক অসাধারণ অনুভূতি। মানুষগুলো তাদের কুড়ি বছর আগের স্বপ্নের সঙ্গে আজকের বাস্তবতাকে মেলানোর এক বিরল সুযোগ পেয়েছে।

কণ্ঠস্বরই কি আপনার গোপনীয়তার সবচেয়ে বড় হুমকি
বিশাল ইন্টারনেট জায়ান্ট ইয়াহু হারিয়ে গেছে। কিন্তু একটা সাধারণ মানুষের কাজের প্রতি একাগ্রতা ও বন্ধুত্ব সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হয়েছে।

ভবিষ্যতের আমাকে লেখা আমার নিজের ইমেইলটা অবশ্য খুব সাধারণ ছিল। এর সাবজেক্ট ছিল: ‘আরেব্বাস, এটা তো কাজ করছে!’

ইমেইলের ভেতরে লেখা ছিল, ‘যেভাবেই হোক, তুমি এই জিনিসটাকে ঠিকঠাক কাজ করাতে পেরেছ। যাও, মাইকেল নোয়ারকে খুঁজে বের করো। এই কাজটা সফল করার জন্য সে তোমাকে এক বোতল দামি শ্যাম্পেন খাওয়াতে বাধ্য!’

আসলে এই টাইম মেশিনটা কাজ করেছে কোনো সার্ভারের জন্য নয়। এটা কাজ করেছে মানুষের জন্য। এমন কিছু মানুষের জন্য, যারা একে অপরের প্রতি যত্নশীল ছিল এবং একসঙ্গে দারুণ কিছু তৈরি করতে চেয়েছিল।

সায়েন্টিফিক আমেরিকানে ডেভিড এম. ইওয়ালের মূল লেখা অবলম্বনে শিউলী সুলতানাদিনদিন বড় হচ্ছে গাড়ির আকার, বাড়ছে পৃথিবীর সমস্যা

Read at source