আগামী মাসে চাঁদের উদ্দেশে রওনা দেওয়া ৪ নভোচারী মহাকাশে গিয়ে কী কী খাবেন
· Prothom Alo

স্কুলে যাওয়ার সময় তুমি টিফিনে কী খাবার নিয়ে যাও? হয়তো স্যান্ডউইচ, কেক, ফল বা মজার কোনো বিস্কুট! কিন্তু যাঁরা রকেটে চড়ে চাঁদের দেশে যান, তাঁরা টিফিনে কী খান? মহাকাশে তো আর চাইলেই পাড়ার দোকান থেকে চিপস বা চকলেট কিনে আনা যায় না!
চলতি বছরের এপ্রিল মাসের যেকোনো সময় আর্টেমিস–২ মিশনের চার নভোচারী চাঁদের উদ্দেশে রওনা হবেন। এই পুরো মিশনটি হবে ১০ দিনের। কিন্তু তাঁরা কোথাও নামবেন না। চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এই ১০ দিনে তাঁরা কী কী মজার খাবার খাবেন, চলো তা জানা যাক!
Visit rocore.sbs for more information.
মহাকাশে খাবার খাওয়া কিন্তু পৃথিবীর মতো এত সহজ ব্যাপার নয়। সেখানে ওজনহীনতার কারণে সবকিছু শূন্যে ভাসতে থাকে। তুমি যদি সেখানে একটা টোস্ট বা পাউরুটি খাও, তবে বিস্কুটের ছোট ছোট গুঁড়া বাতাসে ভাসতে শুরু করবে। এই ভাসমান গুঁড়াগুলো হয়তো নভোচারীদের চোখে-মুখে ঢুকে যেতে পারে, কিংবা নভোযানের কোনো জরুরি যন্ত্রপাতির ভেতরে ঢুকে গিয়ে পুরো মিশনকেই বিপদে ফেলতে পারে!
এ জন্য মহাকাশের খাবার খুব সাবধানে তৈরি করতে হয়, যাতে সেগুলো থেকে কোনো গুঁড়া না পড়ে। মহাকাশে খুব কম জায়গায় অনেক খাবার রাখা যায় এবং খাবারগুলো সহজে নষ্ট হয় না। ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো–১১ মিশনে নভোচারীরা যখন প্রথমবারের মতো চাঁদে গিয়েছিলেন, তখন তাঁদের খাবারগুলো দেখতে খুব একটা সুবিধার ছিল না। তাঁদের খেতে হতো প্যাকেট করা শুকনা মুরগির মাংস ও ভাত। এমন খাবার হয়তো তোমার সব সময় খেতে ইচ্ছা করবে না। কিন্তু এখন দিন বদলেছে! বিজ্ঞানীদের কল্যাণে মহাকাশের খাবার এখন অনেক মজাদার হয়ে উঠেছে।
ক্যাপসুল ও প্যারাসুট দিয়ে কেন মহাকাশ থেকে ফিরতে হয়?নানা দেশের নভোচারীরা কাজ করেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। এখানে অবশ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নভোচারীদের দেখা যাচ্ছেনভোচারীদের মেনুতে কী কী থাকছে
আর্টেমিস–২ মিশনের চারজন নভোচারী পৃথিবীতে বসেই অনেক রকম খাবার চেখে দেখেছেন এবং রেটিং দিয়ে নিজেদের পছন্দের খাবারগুলো বেছে নিয়েছেন। তবে ওরিয়ন নামে যে মহাকাশযানে করে তাঁরা যাবেন, সেখানে খাবার রাখার জায়গা খুব কম। কারণ, রকেটে খুব বেশি ওজনের জিনিসপত্র তুলে দেওয়া যায় না। তাই পুষ্টির দিকেও খুব কড়া নজর রাখতে হয়েছে।
সব মিলিয়ে তাঁদের বিশাল মেনুতে থাকছে ১৮৯ রকমের আলাদা আলাদা খাবার ও পানীয়! এর মধ্যে ৫টি বিশেষ খাবার আবার কানাডার তৈরি। তাঁদের প্রতিদিনের সবচেয়ে সাধারণ খাবারের তালিকায় রয়েছে ভেজিটেবল কিশ, সকালের নাশতার সসেজ, বাদাম দেওয়া কিসকিস, আমের সালাদ, ব্লুবেরি দেওয়া গ্রানোলা, কাঠবাদাম ও কাজুবাদাম। ভারী খাবারের মধ্যে আরও থাকছে বারবিকিউ করা গরুর মাংস, ব্রকলি ও গ্রাটিন, ঝাল সবুজ বিনস, ম্যাকারনি অ্যান্ড চিজ, ট্রপিক্যাল ফ্রুট সালাদ এবং বাটারনাট স্কোয়াশ কলিফ্লাওয়ার।
তবে এবার রুটির বদলে দেওয়া হচ্ছে টরটিলা। কেন? ওই যে বললাম, সাধারণ পাউরুটি বা বিস্কুট ছিঁড়ে খেলে অনেক গুঁড়া পড়ে। তাই নভোচারীদের মেনুতে সাধারণ রুটির বদলে রাখা হয়েছে মেক্সিকান রুটি বা টরটিলা এবং গমের তৈরি ফ্ল্যাট ব্রেড। এই রুটিগুলো থেকে গুঁড়া পড়ে না। আর্টেমিস–২ মিশনে নভোচারীরা মহাকাশে বসে মোট ৫৮টি টরটিলা সাবাড় করবেন!
অসুস্থতার কারণে মহাকাশ স্টেশন থেকে আগেই ফিরছেন নভোচারীরাপানীয় এবং মজার সব ফ্লেভার
রকেট উৎক্ষেপণ ও পৃথিবীতে ফিরে আসার দিনটা বাদে বাকি দিনগুলোতে নভোচারীদের জন্য সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবারের রুটিন করা আছে। তাঁরা দিনে মাত্র দুবার স্বাদযুক্ত পানীয় পান করার সুযোগ পাবেন। মেনুতে ১০টির বেশি পানীয় থাকছে। এর মধ্যে আছে কফি, গ্রিন টি, আম-পিচের স্মুদি, চকলেট ও ভ্যানিলা ফ্লেভারের ব্রেকফাস্ট ড্রিংক, লেমোনেড, অ্যাপল সাইডার, আনারসের পানীয়, কোকো এবং স্ট্রবেরি ব্রেকফাস্ট ড্রিংক। মজার ব্যাপার হলো, এই চার নভোচারীর পুরো মিশনে মোট ৪৩ কাপ কফি লাগবে!
মহাকাশে গেলে অনেক সময় মানুষের মুখের স্বাদ কমে যায়, সবকিছু পানসে লাগে। তাই খাবারে স্বাদ বাড়ানোর জন্য পাঁচ রকমের দারুণ হট সস বা ঝাল সস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে আরও থাকছে মেপল সিরাপ, চকলেট স্প্রেড, পিনাট বাটার, ঝাল শর্ষে বা স্পাইসি মাস্টার্ড, স্ট্রবেরি জ্যাম, মধু, দারুচিনি ও অ্যালমন্ড বাটার।
খাওয়াদাওয়ার পর মিষ্টি খাওয়ার শখ মেটাতেও নাসার দারুণ ব্যবস্থা আছে! নাসার চার্ট অনুযায়ী, মিষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকছে চকলেট ও কুকিজ। এ ছাড়া আছে পুডিং, কবলার, ক্যান্ডি বা মিষ্টি দিয়ে মোড়ানো কাঠবাদাম ও কেক।
আমরা ভাবি, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বোধ হয় কোনো গ্র্যাভিটি নেইমহাকাশে কীভাবে রান্না হয়
রকেটে কিন্তু তোমার বাসার মতো কোনো রান্নাঘর বা গ্যাসের চুলা নেই! নভোচারীরা মহাকাশে গিয়ে কোনো খাবার তৈরি করতে পারেন না। তখন তাঁদের শুধু প্যাকেট খুলে সরাসরি খেতে হয়। খাবারগুলো এমনভাবে প্যাক করা থাকে যে সেগুলো বিকিরণমুক্ত এবং নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সুরক্ষিত থাকে। খাওয়ার সময় তাঁরা স্পেসক্রাফটের পানির কল থেকে পরিষ্কার পানি নিয়ে শুকনা বা ফ্রিজ-ড্রায়েড খাবারে মিশিয়ে সেটাকে আবার আগের মতো খাওয়ার উপযোগী করেন। আর খাবারগুলো গরম করার জন্য তাঁদের কাছে ব্রিফকেসের মতো দেখতে একটা দারুণ ওভেন থাকে! খাবারগুলো ছোট ছোট বাক্সে দুই থেকে তিন দিনের জন্য একসঙ্গে প্যাক করা থাকে, যাতে সহজেই বের করে নেওয়া যায়।
অ্যাপোলো আমলের চেয়ে মহাকাশের খাবার এখন অনেক উন্নত হলেও এই আর্টেমিস–২ মিশনে নভোচারীদের মেনুতে একটা জিনিসের খুব অভাব দেখা যাচ্ছে। মেনুতে কোথাও কোনো আইসক্রিম নেই!
সূত্র: পপুলার সায়েন্সআন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছেছেন নতুন চার নভোচারী