মাঠে নারী, মিছিলে নারী; কিন্তু সংসদে?

· Prothom Alo

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দেওয়া প্রশ্নটি হলো—যে নারীরা রাস্তায়, আন্দোলনে, মানববন্ধনে, সামাজিক সংগঠনে সামনে দাঁড়ান, তাঁদের সংসদে দেখা যায় এত কম কেন?

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি বড় আন্দোলনেই নারীরা ছিলেন দৃশ্যমান, সাহসী ও সংগঠক। সাম্প্রতিক সময়ের কথা বলতে গেলে ২০২৪ সালের গণ-অভুত্থানে তাঁরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছেন। যখন বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি গঠিত হলো, মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হলো, ভোট হলো, তখন নারীরা যেন দৃশ্য থেকেই হারিয়ে গেলেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা ছিল গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, এটি হতাশাজনক!

এই বৈপরীত্য সত্যিই ভাবায়… মাঠে ও মিছিলে যে নারীরা দৃশ্যমানতা তৈরি করেন, তাঁরা কি ক্ষমতাকাঠামোয় ঢোকার আগেই থেমে যেতে বাধ্য হন?

অনেকে যুক্তি দেন যে দেশে তো নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে; কিন্তু সংরক্ষিত আসন নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা বা নীতিনির্ধারণী প্রভাব তৈরি করতে পারে না। আমরা জানি, নেতৃত্ব আসে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী লড়াই, মানুষের সরাসরি ম্যান্ডেট এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিজ হাতে গড়ে তোলার মাধ্যমে।

নেতৃত্ব আসে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে দাঁড়ানো, ভোটে জয় লাভ করা এবং মানুষের সরাসরি ম্যান্ডেট পাওয়ার মধ্য দিয়ে। অথচ সাম্প্রতিক নির্বাচনে সর্বমোট নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৪-৫ শতাংশ। অনেক রাজনৈতিক দল কোনো নারী প্রার্থীই দেয়নি। কোথাও কোথাও আবার নারীর ক্ষমতায়নকে ধর্মীয় বা সামাজিক যুক্তিতে প্রশ্নবিদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে, যা বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তাই প্রশ্ন ওঠে—নারীদের কি ইচ্ছাকৃতভাবেই রাজনীতির মূলধারা থেকে দূরে রাখা হচ্ছে?

আমাদের মনে রাখতে হবে যে শক্তিশালী গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে হয় না; সিদ্ধান্ত–প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণেই তা সম্ভব। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর বার্তা—‘রাইটস, জাস্টিস, অ্যাকশন। ফর অল ওমেন অ্যান্ড গার্লস’ এবং ‘গিভ টু গেইন’ ক্যাম্পেইন—আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অধিকার আদায় করতে হলে নারীর নিজেকেই জায়গা করে নিতে হবে, রাষ্ট্রকে আইন-নীতি কাঠামো এবং আইন প্রয়োগে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

দলীয় মনোনয়ন-সংস্কৃতিতে নারীদের জায়গা বরাবরই সংকুচিত। ‘নারী প্রার্থী দিলে জেতা কঠিন’—এমন ধারণা দলগুলোতে এখনো খুবই শক্ত। তাই মনোনয়ন পর্যায়েই নারীরা বাদ পড়ে যান। এর সঙ্গে যোগ হয় রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা, অনলাইন ট্রোলিং ও বিদ্বেষ, যা বিশেষত তরুণ নারীদের রাজনীতি থেকে নিরুৎসাহিত করে। এ ছাড়া আছে সামাজিক চাপ ও নির্বাচনী মাঠে নিরাপত্তাহীনতা। সাম্প্রতিক একাধিক মানবাধিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নারীদের জন্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিরাপদ নয়; আর সেটিই তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দিচ্ছে।    

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো আন্দোলনে নারী দৃশ্যমান; কিন্তু স্থায়ী রাজনীতিতে তাঁরা অনেকটা অদৃশ্য। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীরা সংগঠক, বক্তা ও সমন্বয়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন; কিন্তু আন্দোলনের পর যখন রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি হলো, তখন নারীদের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেল। গবেষণা বলছে, যাঁরা জুলাই আন্দোলনে সামনে ছিলেন, তাঁরা অনেকেই মনোনয়ন পাননি বা সিদ্ধান্ত-নির্ধারণের আলোচনায় জায়গাই পাননি। অথচ ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল যে নির্বাচনে প্রতিটি দল ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেবে। কিন্তু সেটির বাস্তবায়ন আমরা দেখলাম না।

ভোট টানবে নারী, কিন্তু প্রার্থী হতে পারবে না!

নারীদের এই অনুপস্থিতি শুধু নারীর ক্ষতি নয়, এটি দেশের ক্ষতি। যখন সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় নারীর সংখ্যা কম থাকে, তখন নীতি প্রণয়ন একপেশে হয়ে যায়। বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়লে সামাজিক খাতই নয়; বরং অর্থনীতি, বাজেট, অবকাঠামো ও ন্যায়বিচার-সংক্রান্ত আলোচনা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়; কিন্তু বাস্তবে নারীরা এখনো মূলত ‘সামাজিক’ খাতেই বেশি প্রতিনিধিত্ব পান, বড় অর্থনৈতিক বা কৌশলগত নীতিতে নয়, অনেক দলীয় কাঠামোতেও একইভাবে ‘অভ্যন্তরীণ সজ্জা’ হিসেবেই নারীর উপস্থিতি ব্যবহৃত হয়।

রাজনীতিতে নারীর কম উপস্থিতি কেবল দলীয় কাঠামোর সমস্যা নয়; সমাজের ভেতরেও আছে আস্থার সংকট। অনেকে ভাবেন, নারী প্রার্থী হয়তো চাপ সামলাতে পারবেন না, দর-কষাকষি করতে পারবেন না। এমনকি কর্মক্ষেত্র যেমন কারখানায় নারী প্রার্থী দাঁড়ালেও নারী শ্রমিকেরাই অনেক সময় তাঁদের ভোট দেন না; যা ভেতরের আস্থাহীনতার চিত্র তুলে ধরে; কিন্তু গবেষণা বলছে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়লে পরিবার, শিশু, সমাজ—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়। নারীর শক্তিশালী নেতৃত্বের উদাহরণই অন্য নারীর আস্থা গড়ে তোলে।  

নারী প্রশ্নে নতুন সরকারের দায়

অর্থনীতিতেও নারীর অবদান বিশাল, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে। তবু নেতৃত্বের পদের ক্ষেত্রে তাঁরা পিছিয়ে। যে কয়েকটি প্রকল্পে নারীদের নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ নারী সুপারভাইজার পদে যেতে পেরেছেন এবং তাঁদের নেতৃত্বে উৎপাদনও বেড়েছে। অর্থাৎ সুযোগ পেলে নারীরা নেতৃত্ব দিতে সক্ষম—এটিই তার প্রমাণ।  

তবে সমাধানও আছে; এবং তা জটিল নয়। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী মনোনয়ন (৩৩ শতাংশ) নিশ্চিত করতে হবে; এটি ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ৫০-৫০ সমতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতিমালা (ইউএন, এসডিজিএস) এ লক্ষ্যের সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ সহায়তায় নারীদের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে…সহিংসতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো, হুমকি—এসবের দ্রুত প্রতিকার থাকতে হবে। এ ছাড়া নারী নেতৃত্বের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নীতিপাঠ, গণসংযোগ, মিডিয়া হ্যান্ডলিং প্রয়োজন।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে শক্তিশালী গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে হয় না; সিদ্ধান্ত–প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণেই তা সম্ভব। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর বার্তা—‘রাইটস, জাস্টিস, অ্যাকশন। ফর অল ওমেন অ্যান্ড গার্লস’ এবং ‘গিভ টু গেইন’ ক্যাম্পেইন—আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অধিকার আদায় করতে হলে নারীর নিজেকেই জায়গা করে নিতে হবে, রাষ্ট্রকে আইন-নীতি কাঠামো এবং আইন প্রয়োগে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রাজনীতির মাঠে, সংসদে ও জনপরিসর—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি শুধু নারীর জন্য নয়, এটি দেশের অগ্রগতি, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা।

  • ফারহানা জুবাইদা ঊর্মি প্রকল্প সমন্বয়ক, কর্মজীবী নারী
    ই–মেইল: [email protected]  
    *মতামত লেখকের নিজস্ব

Read at source