একজন জেন-জি শিক্ষক বলছি
· Prothom Alo

জেন–জিকে বুঝতে গিয়ে হিমশিম খান কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক। কিন্তু যে শিক্ষক নিজেও একই প্রজন্মের প্রতিনিধি, তিনি কী বলছেন? পড়ুন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) প্রভাষক তাবাসসুম নুহার লেখা।
Visit een-wit.pl for more information.
২০২২ সালে যখন শিক্ষকজীবন শুরু করি, তখন অনুভূতি ছিল মিশ্র। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, সেখানেই ফিরেছি শিক্ষক হয়ে—এটা তো দারুণ পাওয়া! তবু নিজের ভেতর কাজ করছিল অদ্ভুত এক দ্বৈততা। আমি শিক্ষক, কিন্তু বয়সে খুব দূরে নই শিক্ষার্থীদের থেকে। আমি নিজেও জেন–জি। ডিজিটাল সময়ে বড় হওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা বোঝা, ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মেলানো এক প্রজন্মের অংশ। তবু ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, একই প্রজন্মের হলেও ভূমিকার সঙ্গে বদলায় দৃষ্টিভঙ্গি।
ছাত্রজীবন বনাম শিক্ষকতা
ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী হিসেবে ছিলাম শান্ত। আমার কাছে নীরবতা ছিল ভদ্রতার চিহ্ন। প্রশ্ন করার আগে বারবার ভাবতে হতো, ‘বলব?’, ‘ভুল কিছু বলছি না তো?’ এই দ্বিধা অমূলক নয়। কারণ, কিছু শিক্ষকের ক্লাসে সহপাঠীরা প্রশ্ন করলে তাদের নানাভাবে হেয় করা হতো। শিক্ষকের সঙ্গে দূরত্ব ছিল স্বাভাবিক।
আজকের জেন–জি শিক্ষার্থীরা সেই দূরত্ব মানে না। তারা সরাসরি প্রশ্ন করে। তারা জানতে চায়। তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরেও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাদের কৌতূহলের বিষয়।
হাজারের বেশি লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন ডা. মমতাজ, পড়ুন তাঁর অভিজ্ঞতাপ্রথমে মনে হতো, এটা কি ওদের একধরনের অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ? পরে বুঝলাম, আদতে এটা ‘অংশগ্রহণের দাবি’। এটাই চিন্তার স্বাধীনতা। এই প্রজন্ম সেই স্বাধীনতার চর্চা করছে; কখনো অপ্রস্তুত করে, কখনো মুগ্ধ করে।
প্রযুক্তি—টুল নয়, পরিবেশ
জেন–জি তথ্যের অভাবে নয়, তথ্যের আধিক্যে বড় হয়েছে। আমাদের সময়ে প্রযুক্তি ছিল সহায়ক উপকরণ। এখনকার শিক্ষার্থীদের কাছে প্রযুক্তি একধরনের বাসস্থান। ক্লাসে এই প্রভাব স্পষ্ট। দীর্ঘ লেকচারের চেয়ে ভিজুয়াল, ইন্টারঅ্যাক্টিভ ও সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনায় তারা বেশি সাড়া দেয়।
ক্লাসে মুঠোফোন মানেই মনোযোগহীনতা, এমন ধারণা এখন আর টেকে না। কারণ, ওই মুঠোফোনেই অনেকে রেফারেন্স খোঁজে, নোট নেয়, যাচাই করে তথ্য। তবে একই সঙ্গে স্বীকার করতেই হবে, এই দ্রুততার মধ্যে মনোযোগ ভেঙেও যায়। তথ্যের প্রাচুর্য গভীর মনোযোগের চর্চাকে কঠিন করে তোলে।
ভাষার পরিবর্তন
এই প্রজন্মের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভবত ভাষায়। তারা বাংলা, ইংরেজি, ইন্টারনেট স্ল্যাং—সব মিলিয়ে নতুন এক হাইব্রিড ভাষা তৈরি করছে। ভাষাবিদেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভাষার বিবর্তনকে দ্রুততর করেছে। তরুণদের ভাষা তাই এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, পরিচয়ের প্রকাশও।
ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কথাতেও প্রায়ই ‘ক্রিঞ্জ’, ‘ডেলুলু’, ‘পুকি’—এ ধরনের শব্দ চলে আসে। শুরুতে ভাবতাম, একাডেমিক পরিসরে এই ভাষা কি মানায়? পরে দেখলাম, এই ভাষা তাদের চিন্তার তাৎক্ষণিক প্রকাশ। তবে একাডেমিক বিশ্লেষণের জন্য কাঠামোবদ্ধ ভাষার প্রয়োজনীয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) প্রভাষক তাবাসসুম নুহাকোথায় তাদের শক্তি
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, জেন–জি আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে মতপ্রকাশে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। তারা লিঙ্গসমতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে।
ডেলয়েটের বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ জেন–জি মনে করেন, নিজেদের কাজের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি।
ক্লাসরুমেও সেই সচেতনতা দেখা যায়। তারা শুধু তত্ত্ব শেখে না, বাস্তব উদাহরণ টানে, সমালোচনামূলক প্রশ্ন তোলে।
২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু, এখন ভাড়া আর বেতন বাবদই দেন ১৪ লাখ টাকার বেশিচ্যালেঞ্জ কোথায়
জেন-জি তরুণেরা দ্রুত ফল চায়, দ্রুত প্রতিক্রিয়া চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলনার সংস্কৃতি তাদের ভেতরে অদৃশ্য চাপ তৈরি করে।
ফোমো (ফিয়ার অব মিসিং আউট), অর্থাৎ কোথাও পিছিয়ে পড়ার ভয় তাদের অনেক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ কিন্তু সেই ‘মাঝে’ এখন অনেকটাই ভার্চ্যুয়াল। বাস্তব ও ভার্চ্যুয়াল মিলেমিশে একাকার।
প্রজন্মের সংলাপ
প্রতিটি প্রজন্ম আগের প্রজন্মের কাছে কিছুটা অচেনা। ইতিহাস বলছে, এই অচেনা ভাবটাই পরিবর্তনের সূচনা করে। জেন–জিও তার ব্যতিক্রম নয়। তারা অস্থির, কখনো কখনো আবেগপ্রবণ। কিন্তু তারা সৃজনশীল, সচেতন ও পরিবর্তনের পক্ষে। জেন–জিকে বুঝতে হলে ভালো শ্রোতা হতে হবে। আমি উপলব্ধি করেছি, শাসন দিয়ে নয়, সংলাপ দিয়ে এই প্রজন্মকে অনুধাবন করা যায়। আমি তাদের তত্ত্ব শেখাই। তারা আমাকে শেখায় সময়ের গতি, ভাষার বিবর্তন ও প্রশ্ন করার সাহস।
এই পারস্পরিক শেখার মধ্যেই ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা লুকিয়ে আছে।