রমজান শেষ, আমলও কি শেষ
· Prothom Alo

পবিত্র রমজান মাস বিদায় নিয়েছে। অনেক মুসলমান এই এক মাস ইবাদত-বন্দেগিতে খুব মশগুল থাকেন, কিন্তু মাস শেষ হতেই আবার আগের গাফিলতিতে ফিরে যান। পূর্বসূরি আলেমরা এমন লোকদের সম্পর্কে বলতেন, ‘তারা কতই না মন্দ লোক, যারা রমজান ছাড়া আল্লাহকে চেনে না!’
প্রকৃতপক্ষে মুমিনের ইবাদত কেবল রমজানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মৃত্যু পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমার মৃত্যু না আসা পর্যন্ত তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৯৯)
Visit een-wit.pl for more information.
রোজা কি কেবল রমজানেই
রমজানের ফরজ রোজা শেষ হলেও বছরজুড়ে নফল রোজার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৪)
এছাড়া প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা সুন্নাত। প্রতি মাসে অন্তত তিনটি রোজা (আইয়ামে বিজ বা চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রাখার ব্যাপারেও নবীজি (সা.) তাগিদ দিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৬১)
কোরআন, সুরা হিজর, আয়াত: ৯৯তোমার মৃত্যু না আসা পর্যন্ত তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো।রমজানে শেষ নয় রোজারাতের নামাজ
রমজানে আমরা তারাবি ও তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হই। রমজান শেষ মানেই রাতের নামাজ শেষ নয়। রাতের ইবাদত নেককার লোকদের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ) আঁকড়ে ধরো, কারণ এটি তোমাদের আগের নেককার লোকদের অভ্যাস এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪৯)
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-কে নবীজি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না ভালো মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’ এরপর থেকে তিনি রাতে খুব কমই ঘুমাতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১২১)
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক
রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। এ মাসে আমরা প্রচুর কোরআন পড়ি। কিন্তু রমজান চলে যাওয়ার পর কোরআন যেন কেবল তাকে তুলে রাখা না হয়। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সে রাতে-দিনে, সফরে বা বাড়িতে—সব অবস্থায় কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআনের নিয়মিত চর্চা করো। যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ—রশি খুলে দিলে উট যেমন পালিয়ে যায়, কোরআন তার চেয়েও দ্রুত মানুষের অন্তর থেকে চলে যায়।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম; মিশকাত, হাদিস: ২১৮৫)
শুধু রমজান নয়, মৃত্যু পর্যন্ত ইবাদতইবাদত কেবল বিশেষ কোনো মাসের জন্য নয়, বরং তা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এই পথ যেন রমজানের সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে না যায়।
দান-সদকা ও মানবিকতা
রমজান মাসে মানুষ অকাতরে দান করে। কিন্তু অভাবী মানুষের প্রয়োজন কেবল রমজানেই থাকে না, বরং সারা বছরই থাকে। কোরআনে সফল মুমিনদের গুণ হিসেবে বলা হয়েছে, তারা রাতে ও দিনে, প্রকাশ্যে ও গোপনে দান করে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৪)
নবীজি (সা.) সবসময়ই দানশীল ছিলেন, তবে রমজানে তাঁর দান করার গতি ঝোড়ো হাওয়ার চেয়েও বেড়ে যেত। এই দানশীলতার ধারা রমজান পরবর্তী সময়েও বজায় রাখা উচিত।
আমল কবুলের দুশ্চিন্তা
রমজান পরবর্তী সময়ে মুমিনের বড় চিন্তা হওয়া উচিত—আমার আমলগুলো কি কবুল হলো? হজরত আলি (রা.) রমজানের শেষ রাতে বলতেন, ‘হায়, যদি জানতাম কে কবুল হয়েছে তবে তাকে অভিনন্দন জানাতাম, আর কে বঞ্চিত হয়েছে তবে তাকে সান্ত্বনা দিতাম!’
মনে রাখতে হবে, রমজানে মাগফিরাত বা পাপ মাফের সাধারণ প্রতিশ্রুতি কেবল তাদের জন্য যারা বড় বড় পাপ থেকে বেঁচে থাকে। মহাপাপী যারা, তাদের অবশ্যই খাঁটি মনে তওবা করতে হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৩)
ইবাদত কেবল বিশেষ কোনো মাসের জন্য নয়, বরং তা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এই পথ যেন রমজানের সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
শাওয়ালের ছয় রোজা: অল্প আমলে সারা বছরের সওয়াব