কেনাকাটায় সাক্ষী রাখা ইসলামে কেন গুরুত্বপূর্ণ

· Prothom Alo

লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘ইশহাদ’ বা সাক্ষী রাখা। সাধারণ ছোটখাটো কেনাকাটায় সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক না হলেও জমিজমা, গাড়ি, বাড়ি বা ভারী যন্ত্রপাতির মতো মূল্যবান সম্পদ কেনাবেচার ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখা এবং লিখিত চুক্তি করা অত্যন্ত জরুরি।

এটি কেবল ধর্মীয় বিধানই নয়, বরং আধুনিক সময়ের জটিল আইনি জটিলতা থেকে বাঁচার একটি রক্ষাকবচ।

Visit catcross.biz for more information.

ব্যবসায়িক লেনদেনে মানুষের ভুল হওয়া, তথ্য ভুলে যাওয়া কিংবা অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো পক্ষ থেকে চুক্তি অস্বীকার করার সম্ভাবনা থাকে। সাক্ষী ও লিখিত দলিল এই অনিশ্চয়তা দূর করে।

বিশেষ করে বড় লেনদেনে উভয় পক্ষ একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত হলেও ইসলামি নীতি অনুযায়ী দলিল ও সাক্ষী রাখা উত্তম, যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো বিবাদ বা সন্দেহের অবকাশ না থাকে।

সাক্ষী রাখা কেন প্রয়োজন, তার বড় একটি কারণ হলো মানুষের মরণশীলতা। অনেক সময় ক্রেতা বা বিক্রেতার একজন মারা গেলে উত্তরাধিকারীরা পূর্বের অধিকার নিয়ে দাবি তুলতে পারে।

দলিল ও সাক্ষীর গুরুত্ব কেন

মূল্যবান সম্পদ কেনাবেচার ক্ষেত্রে ইসলামি ফকিহরা একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা বলেছেন। যদি কেউ ঘর-বাড়ি বা জমি ক্রয় করেন, তবে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা উচিত:

১. বিস্তারিত বর্ণনা: চুক্তিনামায় বিক্রয়কৃত বস্তুর অবস্থান, সীমানা ও গুণাগুণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।

২. অর্থের বিবরণ: মোট মূল্য কত, কত টাকা নগদ দেওয়া হলো এবং কত টাকা বাকি রইল, তা নির্দিষ্ট করা।

৩. শর্তাবলি: ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার বিশেষ কোনো শর্ত থাকলে তা চুক্তিতে লিপিবদ্ধ করা।

৪. সাক্ষী নিয়োগ: চুক্তির সত্যতা প্রমাণের জন্য দুজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষী রাখা। পুরুষ সাক্ষী না পাওয়া গেলে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা সাক্ষী রাখা যেতে পারে।

অনলাইন ক্যাটালগ ও ই-কমার্সের শরিয়া দৃষ্টিকোণ

সাক্ষী রাখা কেন প্রয়োজন, তার বড় একটি কারণ হলো মানুষের মরণশীলতা। অনেক সময় ক্রেতা বা বিক্রেতার একজন মারা গেলে উত্তরাধিকারীরা পূর্বের অধিকার নিয়ে দাবি তুলতে পারে। 

আবার মানুষ হিসেবে আমরা স্বভাবগতভাবেই ভুল ও বিস্মৃতির শিকার। সাক্ষী থাকলে এই মানবিক দুর্বলতাগুলো লেনদেনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না।

সাধারণ লেনদেন ও শিথিলতা

নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো পণ্য বা সস্তা দ্রব্যাদির ক্ষেত্রে কেনাবেচায় সাক্ষী রাখা বা লিখে রাখা বাধ্যতামূলক নয়। যদি প্রতিটি ছোট ছোট সওদার জন্য সাক্ষী বা দলিল করতে হতো, তবে মানুষের জীবনে প্রচণ্ড কষ্ট ও সংকটের সৃষ্টি হতো।

ইসলাম কখনোই মানুষের ওপর অযৌক্তিক বোঝা চাপিয়ে দেয় না। সাধারণ কেনাকাটায় মৌখিক সম্মতি ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে লেনদেন করাই যথেষ্ট।

কোরআনের দীর্ঘতম আয়াতের নির্দেশনা

লেনদেনের এই সামগ্রিক বিধান পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াতে—অর্থাৎ সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই আয়াতটিকে ‘আয়াতুদ দাইন’ বা ঋণের আয়াত বলা হয়। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদে একে অপরের সঙ্গে ঋণের কারবার করো, তখন তা লিখে রাখো। আর তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে তা লিখে দেয়... আর তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দুজন সাক্ষী রাখো। যদি দুজন পুরুষ না থাকে, তবে একজন পুরুষ ও দুজন নারী—যাদের সাক্ষ্যের ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট। যাতে তাদের একজন ভুলে গেলে অন্যজন তাকে মনে করিয়ে দেয়... তবে যদি নগদ ব্যবসা হয় যা তোমরা পরস্পরের মধ্যে হাতবদল করো, তবে তা না লিখলে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই। আর তোমরা যখন কেনাবেচা করো, তখন সাক্ষী রেখো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮২)

কীভাবে দান করলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হবেইমাম ইবনে কাসির (রহ.)লেনদেন ছোট হোক বা বড়, তা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হলে লিখে রাখা এবং সাক্ষী রাখা অধিকতর ইনসাফপূর্ণ ও সংশয়মুক্ত।

এই আয়াতে আল্লাহ–তাআলা ‘তিজারাতান হাদিরাতান’ বা নগদ ব্যবসার ক্ষেত্রে লিখে না রাখলে ছাড় দিলেও কেনাবেচার সাধারণ চুক্তিতে সাক্ষী রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। এটি সামাজিক শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি ঐশী কৌশল।

আইনি গুরুত্ব

ইসলামি আইনশাস্ত্রে লেনদেনের এই পদ্ধতিকে ‘আদাবুল মুয়ামালাত’ বা লেনদেনের শিষ্টাচার বলা হয়। ইমাম কুরতুবি (রহ.) তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে এই আয়াতটি ঋণ ও ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশদ নিয়মাবলি সংবলিত, যা মানুষের সম্পদ রক্ষা এবং পারস্পরিক বিবাদ নিরসনে শ্রেষ্ঠ সমাধান। (আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ৩/৩৭৫, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, লেনদেন ছোট হোক বা বড়, তা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য হলে লিখে রাখা এবং সাক্ষী রাখা অধিকতর ইনসাফপূর্ণ ও সংশয়মুক্ত। (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/৭১২, দারু তাইয়িবাহ, মদিনা, ১৯৯৯)

আধুনিক প্রেক্ষাপটেও প্রতিটি দেশের প্রচলিত আইনে স্থাবর সম্পদ বা বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে রেজিষ্ট্রেশন ও সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। ইসলামের এই চৌদ্দশ বছর আগের নির্দেশ মূলত আধুনিক বিচারব্যবস্থারও ভিত্তি।

সম্পদ যেভাবে পরিশুদ্ধ করবেন

Read at source