স্বৈরশাসনের দোষ সংবিধানের নয়, অপব্যবহারকারীদের: শাহদীন মালিক

· Prothom Alo

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধানবিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘১৯৭২ সালের সংবিধান নির্ভুল ছিল না। তার কোনো দোষ-ত্রুটি ছিল না, তা–ও নয়। কিন্তু বিগত ১৫ বছরের স্বৈরশাসন, জবাবদিহিহীনতা বা স্বেচ্ছাচারিতা—এটা সংবিধানের দোষ নয়। সংবিধানকে যারা বারবার অপব্যবহার করেছে, তাদের দোষ।’

Visit biznow.biz for more information.

আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধান’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় শাহদীন মালিক এ কথা বলেন। গত ২২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।

বক্তৃতায় শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমাদের অধিকারহীনতা, বিশেষ করে গত ১৫ বছরে অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হতে, দুঃশাসন-কুশাসন এবং অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হতে হতে যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে রুখে দাঁড়ানোই আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য। জুলাই-আগস্টে যে সরকারের বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়ালাম, সেই সরকারটার কোনো নৈতিক ও আইনগত বৈধতা ছিল না। তাকে উচ্ছেদ করা খুবই প্রয়োজন ছিল। সরাসরি সুবিধাভোগী এবং সরকারের বেতন নেওয়া আমলা-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর লোক ছিল না। স্বৈরশাসকদের এটাই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।’

‘বিগত বছরগুলোতে দেশে আইনের শাসন না থাকার দোষ আমরা আইনকে দিচ্ছি’ উল্লেখ করে শাহদীন মালিক বলেন, ‘বলা হচ্ছে, আইনের শাসন না থাকার দোষ হলো আইনের। আইনের শাসন না থাকার দোষ কিন্তু আইনের নয়; আইনকে যারা অপপ্রয়োগ করে, দোষ তাদের। কিন্তু আমাদের বর্তমান আলোচনাটা আমার কাছে মনে হয় এভাবে আবর্তিত হচ্ছে যে দেশে আইনের শাসন ও জবাবদিহি না থাকার মূল দোষ আইনের। কিন্তু এটা কখনো আইনের দোষ নয়। যারা আইনটাকে ব্যবহার করে, অপপ্রয়োগ করে বা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, আমরা তাদের কথা ভুলে গিয়ে যদি আইনকে দোষ দিই, তাহলে বোধ হয় সুবিচার করা হবে না।’

‘বাহাত্তরের সংবিধানের রচয়িতারাই বিচ্যুতির জন্য দায়ী’

বক্তৃতায় সংবিধানবিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বাহাত্তরের গণপরিষদ সদস্যদের প্রশংসা করে বলেন, দেশে তখন যে পরিস্থিতি ছিল, তাতে চাইলে আরও দু-তিন বছর গণপরিষদ সংসদ হিসেবে কাজ করতে পারত। সেই পরিস্থিতি দেশে ছিল। কিন্তু তাঁরা সেটা করেননি। গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করে চলে গেছে, নিজের মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি, এই উদাহরণ আর পাওয়া যাবে না বললেই চলে। সেই গণপরিষদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল।

শাহদীন মালিক বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এক বছর ধরে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও ভালো-মন্দ যাচাইয়ের পর বাহাত্তরের সংবিধান হয়েছিল। গণপরিষদ সদস্যরা বহু দেশের সংবিধান থেকে উদাহরণ টেনেছেন। তখন তো গুগল ছিল না। আশ্চর্য লাগে যে তাঁরা সেগুলো জেনেছিলেন কেমন করে? তখন দেশে অনেক সংকট। এত কিছুর মধ্যেও এসব আলাপ-আলোচনা কীভাবে কোথা থেকে তাঁরা করলেন!

জনগণের ক্ষমতা ও অধিকার নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে বাহাত্তরে যে সংবিধান হয়েছিল, তার থেকে সরে আসার যাত্রা সাত মাসের মাথায় প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন শাহদীন মালিক। সংবিধানের কয়েকটি সংশোধনীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে সর্বগ্রাসী ছিল ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে হওয়া চতুর্থ সংশোধনী। এর মাধ্যমে একদলীয় বাকশালী ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেল। অর্থাৎ সংবিধান যে আদর্শের জন্য করা হয়েছিল, তার থেকে বিচ্যুতি শুরু করতে আমাদের বেশি দিন সময় লাগেনি।’ সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে সামরিক ফরমান জারি করে সংবিধান সংশোধনের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

বাহাত্তরের সংবিধান যাঁরা রচনা করেছেন, অনেকাংশে তাঁরাই আবার এটার বিচ্যুতির জন্য দায়ী ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, এখনই এটা সংশোধন করতে হবে, সাংঘাতিক জরুরি অবস্থা আছে, এখনই এটা সংশোধন না করলে দেশের সমূহ ক্ষতি হয়ে যাবে—বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে এসব যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

‘সংসদে আইন নিয়ে আলোচনা হয় না’

কয়েকটি সংসদের কার্যবিবরণী পড়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বক্তৃতায় শাহদীন মালিক বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংসদে আইন সম্পর্কে কোনো আলোচনাই হয় না। আইনটিতে কী লাভ-ক্ষতি, প্রয়োগ হলে তাঁরা কীভাবে লাভবান হবে, সেই আলোচনায় জনগণের অংশগ্রহণ থাকে না।

শাহদীন মালিক বলেন, ‘যেকোনো আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাভাবনা করে, কেন কী করা হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য কী—এগুলো দেখতে হবে। এই আলোচনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সংসদ হলো আইন প্রণয়নের জন্য আলাপ-আলোচনার জায়গা। আমাদের দুর্ভাগ্য, গত কয়েকটি সংসদে ৬০-৭০ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী। তাঁরা বোধ হয় কখনো আইনও পড়েননি। ফলে আইন নিয়ে আলোচনাগুলো হয় না। এই আলোচনাগুলো হওয়া দেশে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পূর্বশর্ত।

সব ক্ষেত্রে ‘ইয়েস’ বললে সংসদের দরকার কী

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে বর্তমান সংসদে যে আলোচনা হচ্ছে, সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, যদি আলোচনাটা এমন হয় যে এই সংসদের উচিত হবে সব অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে হুবহু ‘ইয়েস’ বলে দেওয়া, তাহলে সংসদের দরকার কী? অন্তর্বর্তী সরকার প্রতি চার দিনে একটা করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। কীভাবে জারি করেছে? উপদেষ্টাসহ কয়েকজন মিলে একটা কক্ষে আলোচনা করেছেন। অধ্যাদেশের কারণ কী, পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি কী, এটা হলে ভালো-খারাপ কী হবে—এই আলোচনায় কেউই অংশীদার ছিলাম না। কিন্তু আমরা ধরে নিচ্ছি, অন্তর্বর্তী সরকার খুব ভালো কাজ করেছেন, অধ্যাদেশ সংশোধন নিয়ে এত সময় নষ্ট করা হচ্ছে কেন, সংসদ পাস করে দিচ্ছে না কেন?

বিষয়টি নিয়ে টিপ্পনী কেটে শাহদীন মালিক আরও বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, সংসদের দুটি অধিবেশনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০ দিন বিরতি থাকতে পারে। কিন্তু আলোচনা শুনে মনে হচ্ছে, বিরতিটা ৬০ দিনের জায়গায় ১৮০ দিন করে দেওয়া উচিত। এই ছয় মাসে নির্বাহী বিভাগ বা সরকার অধ্যাদেশ করবে, সংসদ ছয় মাস পর তিন দিনের জন্য অধিবেশন করে বলবে পাস, পাস, পাস, পাস, পাস।’

কোনো ঘোষণা ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনুদান বন্ধ হলো

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নির্মিত তথ্যচিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে এ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর পরপরই নৃত্যমের শিল্পীরা একক দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন।

পরে অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাদুঘরে সরকারি সহযোগিতার ব্যত্যয় ঘটেছে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনুদান বন্ধ হলো। এ ধরনের ঘটনার পর দুটি উপলব্ধি হয়েছে। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরতে হলে জাদুঘরকে আরও স্বনির্ভর হতে হবে। আর দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সর্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বার্ষিক প্রতিবেদন পড়ে শোনান প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি মফিদুল হক। তিনিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ট্রাস্টি বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারি তহবিলে দেওয়া অর্থ বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, পৌরকর, নিরাপত্তারক্ষী জোগান ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় ছাড়া অন্য খাতে গ্রহণ করা হবে না। জাদুঘর জনগণের সহায়তায় স্বীয় পরিচালন ব্যয় নির্বাহ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ত্রপা মজুমদার অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। শিল্পী ওয়ার্দা আশরাফের সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।

Read at source